খেলাপি ঋণ আড়াল ও তথ্য গোপনের অভিযোগে এনআরবিসি ব্যাংক

এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসি-এর তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক নিযুক্ত ফরেনসিক অডিটে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে প্রায় ১০ লাখ ৭০ হাজারের বেশি তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে। এসব তথ্যের মধ্যে ঋণ, গ্রাহক ও ট্রেড ফাইন্যান্সসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডও ছিল।
ফরেনসিক অডিট প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তথ্য মুছে ফেলার মাধ্যমে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল, প্রভিশন ঘাটতি লুকানো এবং বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম গোপনের চেষ্টা করা হয়েছে। এসব ঘটনার সঙ্গে ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এসএম পারভেজ তমাল, সাবেক নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান আদনান ইমাম, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকটি ২০২৫ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণের হার ২৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ দেখালেও ফরেনসিক অডিটে প্রকৃত হার ৩৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ঘোষিত তথ্যের তুলনায় খেলাপি ঋণের হার ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।
অডিটে আরও দেখা গেছে, ৩ হাজার ৪৮৭টি ঋণ হিসাবের বিপরীতে কোনো প্রভিশন রাখা হয়নি এবং ভুল তথ্যের ভিত্তিতে শত শত হিসাবের প্রভিশন নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা।
ফরেনসিক অনুসন্ধানে ১২ হাজার ১৮৭টি হিসাব কেওয়াইসি (গ্রাহককে জানুন) নথি ছাড়া খোলার তথ্যও পাওয়া গেছে। অডিটরদের ধারণা, অর্থ পাচার বা অন্যান্য অনিয়মের তথ্য গোপনের উদ্দেশ্যে এসব হিসাব খোলা হয়ে থাকতে পারে।
প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি বড় ঋণ অনুমোদনে অনিয়মের অভিযোগও আনা হয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পুনঃতফসিলের শর্ত পূরণ না করেও ঋণ সুবিধা দেওয়া, খেলাপি ঋণকে নিয়মিত হিসেবে দেখানো এবং আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে নতুন ঋণ অনুমোদনের তথ্য পাওয়া গেছে।
এছাড়া ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে অন্তত ২১৭ কোটি টাকার ঋণ বকেয়া থাকার তথ্য উঠে এসেছে। এসব ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জামানত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফরেনসিক অডিটে বলা হয়েছে, শেয়ার কারসাজির অভিযোগে আলোচিত কিছু প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে ব্যাংকটি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে একটি তথাকথিত ‘ভূতুড়ে ঠিকাদার’ প্রতিষ্ঠানকে ২৯ কোটি টাকার বেশি কাজ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি নিজে কোনো কাজ না করে অন্যদের কাছে কাজ সাব-কন্ট্রাক্ট দিয়েছে। এছাড়া টেন্ডার ছাড়াই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কোটি কোটি টাকার কাজ দেওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে।
ক্রেডিট কার্ড ব্যবস্থাপনাতেও ব্যাপক অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে। অডিটে পর্যালোচনা করা ৬৭টি ফাইলের মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আবেদনপত্র বা কেওয়াইসি নথি পাওয়া যায়নি। একজন কর্মকর্তা একাই ৮৮৯টি ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করেছেন, যার মোট সীমা ছিল ৭৪ কোটি টাকার বেশি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, অপরাধের ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে নির্দেশনা দেওয়া হবে।
অন্যদিকে এনআরবিসি ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া বলেছেন, ফরেনসিক অডিটে চিহ্নিত বিষয়গুলো বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করা হয়েছে এবং প্রশাসনিকভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রতিবেদনে উঠে আসা অভিযোগগুলো দেশের ব্যাংকিং খাতের সুশাসন, জবাবদিহি এবং নিয়ন্ত্রক তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।





